ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ৮:৩০। Wirrawilla Carpark থেকে যখন আমাদের পদযাত্রা শুরু করি, চারপাশের বাতাসে তখনো ভোরের স্নিগ্ধতা। মাত্র কয়েক পা এগিয়েছি, আর চোখের সামনের দৃশ্যপট যেন নিমিষেই বদলে গেল। মনে হলো, ভুল করে ‘নার্নিয়া’-র কোনো এক জাদুকরী অরণ্যে এসে পড়েছি। মাথার ওপরে আকাশ ঢেকে দেওয়া বিশাল সব বৃক্ষ, আর চারপাশ ঘিরে থাকা ট্রি ফার্নগুলো যেন এক অন্য পৃথিবীর গল্প বলছিল। শ্যাওলা ধরা পুরোনো কাঠের ব্রিজ পেরোতে পেরোতে আর হঠাৎ ডেকে ওঠা নাম না জানা পাখির ডাক শুনতে শুনতে কখন যে এই গহীন অরণ্যের মায়াবী নিস্তব্ধতা আমাদের পুরোপুরি গ্রাস করে নিল, তা টেরই পেলাম না।

নিজেদের মতো গল্প করতে করতে আমরা যখন ট্রেইল ধরে ক্রমশ গভীরে প্রবেশ করছিলাম, বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’-এর কথা। চারপাশের এই বৃক্ষরাজির বিশালতা আর গা ছমছমে নিস্তব্ধতা দেখে মনে হচ্ছিল, হয়তোবা বিভূতিভূষণ ঠিক এমনই কোনো এক পরিবেশ থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই লিখেছিলেন তাঁর সেই অমর সৃষ্টি। মনে হচ্ছিল, এই অরণ্যেরও যেন এক নিজস্ব আত্মা (Spirit of the Forest) আছে, যে আমাদের প্রতিটা কথা শুনছে আর এক নীরব শ্রোতা হয়ে ছায়ার মতো আমাদের সঙ্গ দিচ্ছে।

প্রকৃতির এই চলার পথ অবশ্য সবসময় সহজ ছিল না। কোথাও কোথাও ভেঙে পড়া বিশাল গাছ ট্রেইলের পথ আগলে দাঁড়িয়েছিল, আর তখনই আমাদের খুঁজে নিতে হচ্ছিল ঝোপঝাড় পেরোনোর নতুন কোনো রাস্তা। এই ধীরগতির পথচলায় আমাদের আড্ডাও পেয়েছিল নতুন মাত্রা। যে ছোটখাটো বিষয়গুলো নিয়ে আমরা সচরাচর মাথা ঘামাই না, কিংবা যেগুলো বাহ্যিক দৃষ্টিতে জীবনে হয়তো কোনো ভ্যালু যোগ করে না সেই তুচ্ছ বিষয়গুলোই এই আদিম পরিবেশে ভীষণ ইন্টারেস্টিং টপিক হয়ে উঠছিল।

তবে এই অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝেও প্রকৃতির নিজস্ব কিছু পাহারাদার ছিল। কোনো একটা সুন্দর দৃশ্য দেখার জন্য কিংবা কথার রেশ ধরে একটু বেশি সময় এক জায়গায় দাঁড়ালেই, জোঁক নিঃশব্দে জুতো বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছিল!

হাঁটতে হাঁটতে জঙ্গলের ঠিক মাঝখানে এক শ্যাওলাপড়া কাঠের টেবিলের দেখা মিলল। চারপাশের গা ছমছমে নিস্তব্ধতার মাঝে টেবিলটাকে দেখে মনে হলো, এখানেই আমাদের খাবার বিরতিটা নেওয়া উচিত। পুরু সবুজ শ্যাওলার চাদর গায়ে জড়িয়ে থাকা টেবিলটা যেন আমাদের পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছিল। তার নীরবতা যেন ফিসফিস করে আমাদের কাছে জানতে চাইছিল—“বলতে পারো, শেষ কবে কেউ একজন এখানে এসে বসেছিল?”

এভাবেই সবুজের গভীরে হারিয়ে গিয়ে প্রায় ৪-৫ ঘণ্টার এক দীর্ঘ আর মায়াবী হাঁটার পর আমরা আবার ফিরে আসি কারপার্কে। আর এরই সাথে সমাপ্তি ঘটে আমাদের এক অরণ্যযাত্রার। তবে ফেরার পথে সাথে করে নিয়ে আসি এক অদ্ভুত প্রশান্তি।